বিপ্লবীদের নতুন দলের সম্ভাবনা এবং পুরানোদের ভয় ও বাস্তবতা

কাকন রেজা
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৩৩

সারজিস আলম বলেছেন, ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি কোনো রাজনৈতিক দল হবে না, একটি একটি রাজনৈতিক শক্তি।’ আমরাও জানি, মূলত জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্দেশ্যই ছিলো প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করা। কিন্তু এ কথা মানতে হবে সবকিছুই সবসময় পরিকল্পনা মাফিক হয় না। সময় অনেক কিছু ডিমান্ড করে। সেই ডিমান্ডের কথায় পরে আসছি, আগে জানতে চেষ্টা করি, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে পুরানো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভয় কাজ করছে কেন।
এই ভয়টার শুরু মূলত ফখরুদ্দিন-মঈন ইউ আহমেদের এক-এগারোর ঘটনা থেকে। ফখরুদ্দিন-মঈন গ্যাং নিজেরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কিংস পার্টি তৈরি করেছিলেন। বিএনপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল সংস্কারের চেয়ে নির্বাচনকে প্রাধান্য দিচ্ছে তাদের ভয় মূলত সেই কিংস পার্টিকে ঘিরে। এখানে প্রশ্ন করতে পারেন, ফখরুদ্দিন-মঈন এর কিংস পার্টি ফেইল করেছিলো, সুতরাং এখন ভয় কিসের? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, মঈন ইউ আহমেদ মূলত বিদেশী শক্তির মদতে ক্ষমতার লোভে একধরণের ক্যু করেছিলেন। সেই বিদেশী শক্তির প্ররোচনাতেই ঘটে গিয়েছিলো দেশের অভ্যন্তরে লগি-বৈঠার তাণ্ডব। প্রকাশ্যে সাপের মতন পিটিয়ে মারা হয়েছিলো মানুষকে। ক্ষমতায় বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট থাকলেও সিভিল ও পুলিশ প্রশাসন বৈরি ছিলো তাদের। ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জুলাই বিপ্লবে যেভাবে পুলিশ সাধারণ মানুষের প্রতি গুলি ছুড়েছিলো, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো বিপরীতে এক-এগারোর পরিস্থিতিতে পুলিশ ছিলো নিশ্চুপ। আওয়ামী লীগের তাণ্ডব ঠেকাতে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপই নিতে দেখা যায়নি। সিভিল প্রশাসনও বিট্রে করেছিলো। মখা আলমগীরদের ইতিহাস সবারই জানা। সঙ্গতই জুলাই বিপ্লবের সাথে তখনকার পরিস্থিতি কোনভাবেই মেলানো সম্ভব নয়। কারণ চারদলীয় জোট সরকারের সমর্থন আওয়ামী লীগের চেয়ে কম ছিলো না। এমনকি তখনকার চারদলের জোটগত লোক সমাগমও আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ছিলো। জনপ্রিয়তারও কমতি ছিলো না। ওই সময় আওয়ামী লীগ মূলত শেখ হাসিনার নির্দেশে লগি-বৈঠা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে মাঠে ছিলো। বিপরীতে চারদলীয় জোটের সমর্থকরা ছিলো প্রস্তুতিবিহীন। মারমুখী আওয়ামী লীগের লোকজন যখন আক্রমনে তখন যদি পুলিশ মাঝে গিয়ে দাঁড়াতো তাহলে আওয়ামী লীগের মব ভায়োলেন্স সম্ভবত ব্যর্থ হতো।
জুলাই বিপ্লবের সাথে এক-এগারোর মূল পার্থক্যটা এখানেই। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের অনুগত বাহিনী ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব দল-মত-মানুষ এক স্রোতে মিশে গিয়েছিলো। ফলে বাহিনীর বেপরোয়া বুলেটও কাজে দেয়নি। অন্যদিকে এক-এগারোর কালে যদি পুলিশ শুধু টিয়ার শেল ও লাঠি চার্জ করতো তাহলেও চিত্র উল্টো হতে পারতো। কিন্তু পুলিশ বা অন্য বাহিনীরা তা করেনি। মূলত তারা ছিলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটকে সরানোর ধান্ধায়। সে কারণেই এই মব ভায়োলেন্সর সৃষ্টি করা হয়েছিলো অন্তত পরিকল্পিত ভাবে। যেন সেই ভায়োলেন্সকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর অনুগত অফিসারদের দিয়ে একটা কিছু করানো যায়। তাই হয়েছিলো। মঈন ইউ আহমেদ বাধ্য করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করাতে।
প্রশ্ন করতে পারেন, তবে জুলাই বিপ্লবে এতকিছুর পরও জরুরি অবস্থা জারি করতে হলো না কেন? এই প্রশ্নের মধ্যেই জুলাই বিপ্লব আর এক-এগারোর পার্থক্যটা মোটাদাগে দৃশ্যমান। এক-এগারো যারা ঘটিয়েছেন তারা জানতেন, আওয়ামী লীগের অতটা জনসমর্থন ছিলো না যাতে জরুরি অবস্থা ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা যায়। সে কারণেই দু’বছর ধরে বিএনপির উপর চালানো হয়েছে স্টিম রোলার। পাশাপাশি বিএনপির বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে কিংস পার্টি। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
পুনর্বার প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কিংস পার্টি গড়া নিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর এত ভয় কেন। ভয়ের মূল কারণটা হলো পুরানো রাজনৈতিক দলগুলোর কতিপয় নেতা। যে নেতাদের বিলম্বিত নির্বাচনে জিতে আসা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এসব নেতারা ইতোমধ্যেই তাদের ভেতরের চেহারার অনেকটাই মানুষকে দেখিয়ে ফেলেছেন। মানুষ কিছুটা হলেও তাদের চরিত্রের অন্ধকার দিকটা দেখে ফেলেছে। তারা মিলাচ্ছে পতিত ফ্যাসিস্টদের সাথে তাদের মিল কোন জায়গাতে রয়েছে। নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে ততই মানুষ তাদের ভেতরের চেহারাটা আরো বেশি দেখতে পাবে। ফলে নির্বাচন দেরিতে হলে তাদের জিতে আসাটা অনেকটাই অসম্ভব হবে। উল্টো নতুন কোনো প্রার্থী পেলে এবং তারা যদি জুলাই বিপ্লবে পরীক্ষিত হয় তাহলে তাদের জিতে যাওয়া অসম্ভব নয়। ভয়টা এখানেই।
জুলাই বিপ্লব মূলত সংগঠিত এবং সংঘটিত করেছে তরুণ-যুবারা। বলতে গেলে শিক্ষার্থীদের একক প্রচেষ্টায় এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। অবশ্য গত দেড় দশকের রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম-খুন, বাকস্বাধীনতা হরণ এসব মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেছে। বিএনপি, জামাতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের উপর ফ্যাসিস্ট রেজিমের অসহনীয় অত্যাচার মানুষকে তাদের প্রতি সহমর্মী করেছে। ফলে বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিলো প্রতি দুঃশাসন অবসানে বিএনপি সফল হবে। কিন্তু প্রতিবারই মানুষের মনে আশা জাগিয়ে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মানুষ বিএনপির সভা-সমাবেশে অংশ নিলেও মুখোমুখি বিক্ষোভে যা সহিংসও হতে পারে তাতে অংশ নিতে সাহস বা ভরসা পাচ্ছিলো না। মানুষ যখন দেখলো শিক্ষার্থীরা, যাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস নেই, তারা মাঠে নেমে পড়েছে, অকাতরে জীবন দিচ্ছে, তখন মানুষ ভরসার জায়গা খুঁজে পেয়েছিলো। বুঝতে পেরেছিলো এই তরুণরাই তাদের মুক্ত করতে পারে দেড় দশকের বিভিষীকাময় শাসন থেকে। যারফলেই দল-মত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে এসেছিলো মানুষ। পালাতে হয়েছিলো শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে। এই যে তরুণদের উপর মানুষের ভরসা এটাও পুরানো রাজনৈতিক দলগুলোর ভয়ের অন্যতম কারণ। এই তরুণ-যুবারা যদি দল গঠন করে, তাহলে সেই দলও যে মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠবে না, তা কে বলতে পারে। ভয়টা সেখানেও।
এই যে সারজিস’রা বলছেন তারা প্রেশার গ্রুপ হিসেবে থাকতে চান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের চাওয়াটাও বদলাতে পারে। সময় তাদের বাধ্য করতে পারে রাজনৈতিক দল গঠনে। দল গঠনের জন্য তারা দুটো বিশেষ সুবিধা পাবে। প্রথমত: ফ্যাসিস্ট রেজিম হঠানোতে তাদের সফল নেতৃত্ব। দ্বিতীয়ত: পুরানো দলের নেতাদের চেহারা যেমন মানুষের চেনা বিপরীতে বিপ্লবে সফল নেতৃত্বের মহিমার পেছনে তাদের চেহারা মানুষের পুরোটাই অজানা। অর্থাৎ মানুষের কাছে তারা একদম আনকোরা। আরেকটা বিশেষ সুবিধা তাদের রয়েছে, গত দেড় দশকে যতগুলো প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন থেকে তাদের পড়াশোনা শেষ করেছে, তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকবে তরুণদের প্রতি। কারণ তারা দেখেছে এদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। রাজনৈতিক আপোসকামিতা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতা। এসব কারণেই পুরানো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া তরুণরা ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।
যদিও আজকের লেখায় এ আলাপ করতে চাইনি, তবু একটু করে নিই। সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে বাহাস চলছে। যারা দ্রুত নির্বাচন চান, তাদের ধারণা নির্বাচন দিলেই তারা ক্ষমতায় গিয়ে সব ঠিক করে ফেলবেন। কিন্তু তার আগে তো নির্বাচনে জিততে হবে। সংস্কার না হলে এবং এই প্রশাসন দিয়েই যদি নির্বাচন হয় তাহলে ফলাফল উল্টোও হতে পারে। যেহেতু খোদ প্রধান দলই আওয়ামী লীগের নির্বাচন করতে পারার বিষয়ে নমনীয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলে কী হতে পারে তা সচিবালয়ের আগুন থেকেই দলগুলোর আন্দাজ করে নেয়া উচিত। দেড় দশকে প্রতিটা স্তরে ফ্যাসিজমকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে নানা অনৈতিক সুবিধা। পিওন-চাপরাশিরাও হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছে। তারা জানে, নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ কিংবা তাদের সমর্থিত কেউ ক্ষমতায় না আসতে পারে তবে ভবিষ্যতে অবস্থা খারাপ হবে। সুতরাং তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।
এসবের পরেও যদি বিএনপি ও তাদের সঙ্গীয় দল ক্ষমতায় আসে তবে তাদের নামিয়ে দেয়ায় খুব কঠিন হবে না। কারণ দ্রুত নির্বাচন আদায়ে তারা যা করবে তাতে সেনাবাহিনী, সাধারণ মানুষ, জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া তরুণরা তাদের প্রতি খুশি থাকবে না। সারাদেশে শহীদ ও আহতদের পরিবারের মানুষ থাকবে ক্ষিপ্ত। পুলিশকেও আর বিগত রেজিমের মতন দলীয় গুণ্ডাবাহিনীর মতন ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। সুতরাং হযবরল পরিস্থিতিতে নির্বাচনে জিতে এলেও সব চাপ নেয়া কোনো দলের পক্ষে সম্ভব হবে না। সুতরাং সংস্কার সাথে ফ্যাসিস্ট রেজিমের রেখে যাওয়া আগাছা না বাছলে ক্ষমতায় টিকে থাকা সত্যিকার অর্থেই অসম্ভব। আর ক্ষমতায় না থাকলে পরবর্তীতে কী অবস্থা হবে সে বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর। মনে রাখতে হবে একটা বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হতে দেশ দশকের বেশি সময় লেগেছে। বছরে বছরে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। আর বছরে বছরে জান দেবার মতন বিপ্লবী তৈরি হয় না। সুতরাং বৎস তিষ্ঠ ক্ষণকাল।
ফুটনোট : নানান অজুহাতে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের খাটো করার চেষ্টা, অপদস্তের প্রচেষ্টাকেও মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। একই সাথে ভালো চোখে দেখছে না, পুরানো স্টাইলে দখলদারিত্বের চেষ্টাকেও।