বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা থেকে ‘গোষ্ঠীনিষ্ঠ’ সাংবাদিকতায়
এআই
সাংবাদিকদের গুন্ডামি আর ভণ্ডামি বন্ধ না হলে তাদের ওপর আক্রমণও বন্ধ হবে না। এতে কেবল সমাজ সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ন্যায্যতার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হবে। কোনো পরিবর্তন আসবে না। বড়জোর কিছু সাম্রাজ্যবাদী এনজিওর ফান্ড বাড়বে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রচলিত পরিচিতি সম্পাদক বা সাংবাদিক নেতারা কেন যেন খুব একটা চিন্তিত নন। মাথা ঘামাতে পারেন এমন কোনো গবেষণাও চোখে পড়ছে না।
কারণ, তারা সামগ্রিক সাংবাদিকতার দিকে না তাকিয়ে কেবল কোটারি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনছেন। ফলে ন্যায্যতার প্রশ্নের বদলে ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ হলে সাংবাদিকদের বাইরে তাই খুব বেশি মানুষ আহা-উহু করে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে তখন প্রতিক্রিয়া থাকে—‘শালাদের আরেকটু দিল না কেন!’ আমি আক্রান্ত হলে হয়তো বিভিন্ন বিটে মিষ্টি বিতরণ হবে।
আধুনিক রাষ্ট্রগুলো চাইছে সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে যাক। সে কারণে তারা সাংবাদিকতার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার বানায়। অন্যদিকে, বোধসম্পন্ন ও নৈতিক সাংবাদিকতার চেয়ে তারা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় ‘সেক্সি’ সাংবাদিকতাকে।
সমাধানের চেয়ে কোনো বিষয়কে কীভাবে আরও ‘জুসি’ বানানো যায়, সেটাই যেন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। সম্প্রতি এক গণমাধ্যম সম্মেলনে এক সাংবাদিককে বলতে শুনেছি তারা কেন করপোরেটদের সুবিধা পান না।
এলিট অ্যারিস্টোক্র্যাটদের ক্লাব—সম্পাদক পরিষদ, জাতীয়তাবাদী সম্পাদক ফোরাম কিংবা ফ্যাসিবাদের কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত এডিটর গিল্ডস—কেউই গোষ্ঠীস্বার্থের বাইরে ভাবেনি।
বছরের পর বছর কেবল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নয়, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সাংবাদিকতার নামে যে সিন্ডিকেট তথা নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে, সেটিও থামানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন এক রাজনৈতিক কর্মী বলেছিলেন, ‘টিএসসিতে ১৮ টাকায় খাওয়ালে যেখানে ভিকটিমই অপরাধী হয়ে যায়, তুমি সেই পেশায় যাও কী করে?’
আর নিজে এই পেশায় এসে দেখেছি, একটা ফ্রি মদের বোতলের জন্য নামকরা সাংবাদিকদের কী আকুতি! আমিও কোনো দেবদূত নই। যে সাংবাদিকতা বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার কথা, তা হয়ে গেছে ‘গোষ্ঠীনিষ্ঠ’। আমিও এর অংশ।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে যে সুযোগ এসেছিল, তার কিছুটা বাস্তবায়িত না করে আমরা যেন রিসেট বাটন চাপতে গিয়ে রিওয়াইন্ড বাটন চেপে বসেছি। অতিরিক্ত রাজনীতিকরণের কারণে সেই সুযোগের প্রতি আস্থাও হারায় মানুষ।
বামপন্থীদের হাত থেকে সাংবাদিকতা সরাসরি নয়া ডানপন্থী বা কট্টরপন্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে প্রতিশোধগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এতে তো আরও নৈরাজ্য তৈরি হবে। সাংবাদিকরা তখন ত্রিমুখী সংকটের সম্মুখীন হবে—
১. আদর্শিক শত্রু
২. সামাজিক শত্রু
৩. রাষ্ট্রীয় শত্রু।
তৎকালীন উপদেষ্টা নাহিদ বা মাহফুজকে অনুরোধ করেছিলাম, ‘আপনারা এই ভুল করবেন না।’ উল্টো দুজনই আমাকে বলেছেন— আপনার সঙ্গে যার সমস্যা সেটা মিটিয়ে ফেলুন।
তরুণ মেধাবী সাংবাদিক নামজুল আহসানকেও তখন বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তাঁর ‘হাই প্লেস সোর্স’দের বোঝাতে। এমনও পরিস্থিতি হয়েছে, আমার আরেক স্নেহের ছোট ভাই আমার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আবার আমি অনেকের কাছে শ্রদ্ধেয় এমন সাংবাদিককেই পেয়েছি যিনি বিএনপি আসবে না এমন সম্ভাবনায় নির্বাচনের আগে জার্সি পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তারাই এখন সমাজের হর্তাকর্তা এবং নৈতিকতার ছবক পর্যন্ত দেন।
আমি বিধ্বস্ত হয়েছি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা দেখে। আর গণমাধ্যম কমিশন যে কাজ করবে না, তা তো শুরু থেকেই বলেছি। এগুলো এখন সেলফ-স্টোরি হয়ে থাকবে।
আমি আমার চেষ্টা করে যাই। এখনো করছি।
এ ক্ষেত্রে মার্কিনিদের মতো সংখ্যায় নয়, জার্মানদের মতো গুণগত মানে আমি বিশ্বাসী। কারণ, এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকেরা এখনো সব মত ও পথের কথা শুনছেন। কিন্তু পশ্চিমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতা করা আরও জটিল হয়ে উঠবে। এতে উদীয়মান সাংবাদিকরা কেবল হতাশাগ্রস্তই হবে না, বরং দেশ ছাড়তেও বাধ্য হতে পারে।
সেই সঙ্গে যারা ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা করবে বা এর নেতৃত্ব দেবে, তাদের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, সাংবাদিকতা কোনো বিপ্লবী মাধ্যম নয়; বরং ক্ষমতার সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ তৈরি করার একটি মাধ্যম।
সত্যি বলতে, আমরা সাংবাদিকতার একটি অথর্ব প্রজন্ম তৈরি করছি। কেউ হয়তো অসহায় হয়ে করছি, কেউ শখ করে, কেউ হয়তো ধান্দাবাজি বা কাঁচা পয়সার কারণে। ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ শব্দটি সাংবাদিকতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তার বদলে তৈরি হচ্ছে ‘ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপ’।
তাতেই আমরা ক্রমেই সরে যাচ্ছি আমাদের লক্ষ্যবস্তু থেকে।
এলিট অ্যারিস্টোক্র্যাটদের মান রাখতে শেখ হাসিনার শাসনামলে মাহফুজ আনামরা এ বিষয়ে কখনো কখনো কাচ্চি বিরিয়ানি বিলি করার উপলক্ষ খুঁজেছেন। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধানকে প্রাধান্য দেননি। বরং সেখানে গোত্রীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য আইনের প্রস্তাবনা দিয়েছেন। এখন তো দেখি সাংবাদিক নেতারা তাদের জন্য আলাদা স্কুল কলেজ কিংবা হসপিটালের দাবি তুলছেন।
আমি বারবার তর্ক করছি—সাংবাদিকদের জবাবদিহিতার মধ্যে না এনে এবং সমাজে ‘মোরাল কোড’ সেট না করলে সাংবাদিকতাই স্বেচ্ছাচারী রূপ নেবে। স্বাধীনতার নামে বেডরুম থেকে বাথরুমে ঢুকে পড়বে।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় দেখা যায়, রিপোর্টার সেখানে রীতিমতো শাসনক্ষমতার অংশ! কখনো কখনো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মুখপাত্রও হয়ে ওঠেন তারা। আর এখন ন্যায্যতা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ব্যাপক আকারে সাংবাদিকতায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত নেতা সালাহউদ্দিন আম্মারের ভাষায় বলতে হয়, কখনো কখনো দাড়ি কেটে, গোঁফ লাগিয়ে বাম সাজানোর চেষ্টাও করেছেন অনেকে। এতে তিক্ততা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
পাঁচ আগস্টের পরে যেমন সময় টেলিভিশন, ৭১ টেলিভিশন ও এটিএন নিউজ আক্রমণের শিকার হয়েছে, ভবিষ্যতে এর ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আর মফস্বলে যখন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার পর অনিশ্চিত জীবন ও অর্থাভাবে ভুগে কেউ হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, তখন অর্থনৈতিক সুবিধাকে একমাত্র বিবেচনায় রেখে আমাদের মতো তরুণরাও দিকভ্রষ্ট হচ্ছে।
ইউনূস আমলে আটককৃত শ্যামল দত্ত গোয়েন্দাদের হয়ে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় আমাদের প্রথম ‘বাথরুম সাংবাদিকতা’র ধারণা দেন।
কিন্তু আমরা এখনো জানি না, আগামী দিনের সাংবাদিকতায় আমাদের অভিভাবক হিসেবে কে আবির্ভূত হবেন এবং কী নিদর্শন রেখে যাবেন—যাতে মানুষ প্রকাশ্যে এবং গোপনে বলতে পারে, এই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কেবলমাত্র সাংবাদিকতাকেই জনস্বার্থে ব্যবহার করছেন।
বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আমি বলেছি, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে রয়েছে। সাংবাদিকরা যেভাবে কখনো কখনো ‘মনস্টার’ হয়ে উঠছেন, তা ঠেকাতে তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যেমন প্রয়োজন, এই কমিশনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে পাড়ার পাতি মাস্তান পর্যন্ত যারা ভূমিকা পালন করছে, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য, গণমাধ্যমের সঙ্গে গণমানুষের সম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারে—এমন কোনো মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীনদের মধ্যে নেতৃত্বকে প্রস্তুত করা হয়নি, যিনি বা যারা সাংবাদিক নেতা, সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে গণমুখী একটি গণমাধ্যমব্যবস্থাকে বাংলাদেশের জন্য উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
উল্টো আমরা দেখতে পাচ্ছি, অপরাপর সরকারের মতোই অনেক আশা-ভরসা নিয়ে আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও কেবল বিএনপি বিট বা এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষমতায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে বসেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেখানে সাংবাদিকদের মধ্যে সাংবাদিকতার উৎকর্ষতা বা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কীভাবে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা যায়—তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, কীভাবে সাংবাদিকরা সরকারের কাছ থেকে প্লট, ফ্ল্যাট কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেন।
সাংবাদিকরা না খেয়ে থাকুক—এটা আমি কোনোভাবেই চাই না। বরং আমি চাই, সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব গড়ে উঠুক।
যেমন প্রয়োজন অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকতা নীতি নৈতিকতা নির্ধারণ করা, একইভাবে প্রয়োজন ন্যূনতম মূল্যবোধ তৈরি করা।
এক্ষেত্রে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার বুলি আউড়িয়ে গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা যাবে না। দরকার নৈতিকতার ভিত্তিতে গণমাধ্যমকে গড়ে তোলা। যাতে মানুষ ধীরে ধীরে তার গণমাধ্যমের ওপরে আস্থা ফিরে পায়।

